বিভাজ্যতার নীতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। গণিতের দুনিয়ায় আমাদের প্রবেশ ঘটে নামতা শিখার মাধ্যমে। পরবর্তীতে আমরা হয়ে পড়ি ক্যালকুলেটর নির্ভর। কিন্তু সহজ কিছু নিয়ম মনে রেখে ক্যালকুলেটর ছাড়াই অনেক বড় বড় গুণভাগ আমরা করে ফেলতে পারি সহজে। এমনই কিছু বিভাজ্যতার নীতি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে এই ভিডিওতে। এছাড়াও গণিতের আরও মজার বিষয়ে কেমন প্রশ্ন হয়, এবং কীভাবে খুব সহজেই তা সমাধান করা যায় তা দেখে ফেলো এই ক্লাসটি।
বিভাজ্যতার নীতি
গণিতের একটি মজার বিষয় হলো বিভাজ্যতার নিয়ম। কোনো সংখ্যা অন্য কোনো ছোট সংখ্যা (যেমন ১, ২, ৩ ইত্যাদি) দ্বারা নিঃশেষে বিভাজ্য কিনা তা আমরা বিভাজ্যতার সূত্র থেকে সহজেই বের করতে পারি।
বিভাজ্যতার সূত্র কী:
কোনো পূর্ণসংখ্যাকে অন্য কোনো পূর্ণসংখ্যা দিয়ে নিঃশেষে ভাগ করা যায় কিনা তা সহজে নির্ণয়ের নিয়মকে বিভাজ্যতার সূত্র বলা হয়। যেমন, ১২৩ সংখ্যাটি কোন্ কোন্ সংখ্যা দ্বারা নিঃশেষে বিভাজ্য হবে তা আমরা বিভাজ্যতার নিয়ম থেকে সহজেই বের করতে পারি।
১২৩ সংখ্যাটি যেসব সংখ্যা দ্বারা নিঃশেষে বিভাজ্য:-
- ১ দ্বারা, কেননা ১২৩ একটি পূর্ণ সংখ্যা
- ৩ দ্বারা। ১ + ২ + ৩ = ৬। ৬ সংখ্যাটি ৩ দ্বারা বিভাজ্য হওয়ায়, ১২৩ সংখ্যাটিও ৩ দ্বারা বিভাজ্য
- ৪১ দ্বারা। ১২৩ ÷ ৩ = ৪১

১ (এক) দিয়ে বিভাজ্য সংখ্যার সূত্র:
১ এর জন্য কোনো বিশেষ নিয়মের দরকার নেই। কেননা সকল পূর্ণসংখ্যাই ১ দ্বারা নিঃশেষে বিভাজ্য।
২ (দুই) দিয়ে বিভাজ্য সংখ্যার সূত্র:
সকল জোড় সংখ্যা ২ দ্বারা বিভাজ্য। অর্থাৎ যেসব সংখ্যার শেষ অঙ্কটি (Digit) ০, ২, ৪, ৬ অথবা ৮, সেসব সংখ্যা ২ দ্বারা বিভাজ্য। যেমন, ১২, ২৪, ৩৬ ইত্যাদি।
৩ (তিন) দ্বারা বিভাজ্যতার সূত্র:
কোনো সংখ্যার অঙ্কগুলোর যোগফল ৩ দ্বারা বিভাজ্য হলে, ঐ সংখ্যাটিও ৩ দ্বারা বিভাজ্য। যেমন, ১২৩ সংখ্যাটির অঙ্কগুলোর যোগফল = ১ + ২ + ৩ = ৬। এখানে ৬ সংখ্যাটি ৩ দ্বারা বিভাজ্য। সুতরাং ১২৩ সংখ্যাটিও ৩ দ্বারা বিভাজ্য।
যোগফল যদি খুব বড়ো হয়, তাহলে প্রাপ্ত যোগফলটিকে আবার একই সূত্রে ফেলে দেখতে হবে তা ৩ দ্বারা বিভাজ্য হয় কিনা। এভাবে চালিয়ে যেতে হবে। যেমন, ৯৮৭৯৮৭৯৮৭ সংখ্যাটির অঙ্কগুলোর যোগফল ৭২। আবার ৭২ সংখ্যাটির অঙ্কগুলোর যোগফল ৯। এভাবে সর্বশেষ প্রাপ্ত যোগফল ৯ সংখ্যাটি যেহেতু ৩ দ্বারা বিভাজ্য, সুতরাং ৯৮৭৯৮৭৯৮৭ সংখ্যাটিও ৩ দ্বারা বিভাজ্য।
৩ দ্বারা বিভাজ্যতার আরেকটি সূত্র:
কোনো সংখ্যায় যতগুলো ২, ৫ ও ৮ আছে এবং যতগুলো ১, ৪ ও ৭ রয়েছে, তাদের বিয়োগফল ৩ দ্বারা বিভাজ্য হলে সংখ্যাটিও ৩ দ্বারা বিভাজ্য। যেমন, ২৫৮৮১৪৭৭ সংখ্যাটি বিবেচনা করি।
২, ৫, ৮ অঙ্কগুলো রয়েছে মোট ৪টি।
১, ৪, ৭ অঙ্কগুলো রয়েছে মোট ৪টি।
বিয়োগফল = ৪ – ৪ = ০ (শূন্য)।
যেহেতু ০ সংখ্যাটি ৩ দ্বারা বিভাজ্য, সুতরাং ২৫৮৮১৪৭৭ সংখ্যাটিও ৩ দ্বারা বিভাজ্য।
৪ (চার) দ্বারা বিভাজ্য সংখ্যার সূত্র:
কোনো সংখ্যার একক ও দশক স্থানীয় অঙ্কগুলো মিলে যে সংখ্যা তৈরি হয়, তা ৪ দ্বারা বিভজ্য হলে পুরো সংখ্যাটিও ৪ দ্বার বিভাজ্য হবে। আবার কোনো সংখ্যার শেষে/সর্বডানে ০০ (দুটি শূন্য) থাকলেও উক্ত সংখ্যাটি ৪ দ্বারা বিভাজ্য। যেমন, ১২৩৪০ সংখ্যাটির একক ও দশক স্থানীয় অঙ্ক দুটি মিলে ৪০ সংখ্যাটি হয়, যা ৪ দ্বারা বিভাজ্য। সুতরাং ১২৩৪০ সংখ্যাটিও ৪ দ্বারা বিভাজ্য।
৪ দ্বারা বিভাজ্য সংখ্যার আরো কিছু বৈশিষ্ট্য:
- দশক স্থানীয় অঙ্কটি জোড় হলে, একক স্থানীয় অঙ্কটি ০, ৪ বা ৮ হবে।
- দশক স্থানীয় অঙ্কটি বিজোড় হলে, একক স্থানীয় অঙ্কটি ২ বা ৬ হবে।
- দশক স্থানীয় অঙ্কটির দ্বিগুণের সাথে একক স্থানীয় অঙ্কটি যোগ করলে, যোগফল ৪ দ্বারা বিভাজ্য হবে।

৫ (পাঁচ) দ্বারা বিভাজ্য সংখ্যার সূত্র:
কোনো সংখ্যার একক স্থানীয় অঙ্কটি ০ বা ৫ হলে উক্ত সংখ্যাটি ৫ দ্বারা বিভাজ্য হবে। যেমন, ১০৫, ১২০ ইত্যাদি।
৬ (ছয়) দ্বারা বিভাজ্য সংখ্যার সূত্র:
আমরা জানি, ৬ = ২ × ৩
সুতরাং কোনো সংখ্যা যদি একই সাথে ২ এবং ৩ দ্বারা বিভাজ্য হয় তবে উক্ত সংখ্যাটি ৬ দ্বারা বিভাজ্য হবে। আরো সহজ করে বললে, যেসব জোড় সংখ্যা ৩ দ্বারা বিভাজ্য সেগুলো ৬ দ্বারাও বিভাজ্য। যেমন, ১৮, ৭২ ইত্যাদি।
৭ (সাত) দ্বারা বিভাজ্যতার নিয়ম:
৭ দ্বারা বিভাজ্যতার অনেকগুলো সূত্র আছে। কিছু সূত্র বড়ো সংখ্যার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা সুবিধাজনক, আর অন্যগুলো ছোটো সংখ্যার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা সুবিধাজনক।
ছোটো সংখ্যার ক্ষেত্রে ৭ দ্বারা বিভাজ্যতার সহজ সূত্র:
এই নিয়মগুলো ছোটো সংখ্যার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা বেশি সুবিধাজনক। তবে বড়ো সংখ্যার ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা যাবে। সেক্ষেত্রে সূত্র থেকে প্রাপ্ত ফলাফলকে আবার সূত্রে ফেলতে হবে। অর্থাৎ একই নিয়মের পুনরাবৃত্তি করতে হবে।
সূত্র ১
একক স্থানীয় অঙ্কটিকে ২ দিয়ে গুণ করে, গুণফলকে বাকি সংখ্যা থেকে বিয়োগ করি। বিয়োগফল ৭ দ্বারা বিভাজ্য হলে ঐ সংখ্যাটিও ৭ দ্বারা বিভাজ্য। যেমন ৮৫৪-এর ক্ষেত্রে, ৮৫ – (৪ × ২) = ৮৫ – ৮ = ৭৭। এখানে ৭৭ সংখ্যাটি ৭ দ্বারা বিভাজ্য হওয়ায় ৮৫৪ সংখ্যাটিও ৭ দ্বারা বিভাজ্য হবে।
বড়ো সংখ্যার ক্ষেত্রে একই নিয়মের পুনরাবৃত্তি করতে হবে। যেমন,
২৩৪৫৭-এর ক্ষেত্রে, ২৩৪৫ – (৭ × ২) = ২৩৩১
২৩৩১-এর ক্ষেত্রে, ২৩৩ – (১ × ২) = ২৩১
২৩১-এর ক্ষেত্রে, ২৩ – (১ × ২) = ২১
২১ সংখ্যাটি ৭ দ্বারা বিভাজ্য হওয়ায়, ২৩৪৫৭-সংখ্যাটিও ৭ দ্বারা বিভাজ্য।
সূত্র ২
একক স্থানীয় অঙ্কটিকে ৫ দিয়ে গুণ করে, গুণফলকে বাকি সংখ্যার সাথে যোগ করি। যোগফল ৭ দ্বারা বিভাজ্য হলে ঐ সংখ্যাটিও ৭ দ্বারা বিভাজ্য। যেমন,
৮৫৪-এর ক্ষেত্রে, ৮৫ + (৪ × ৫) = ৮৫ + ২০ = ১০৫
১০৫-এর ক্ষেত্রে, ১০ + (৫ × ৫) = ১০ + ২৫ = ৩৫
৩৫ সংখ্যাটি ৭ দ্বারা বিভাজ্য হওয়ায় ৮৫৪ সংখ্যাটিও ৭ দ্বারা বিভাজ্য হবে।
সূত্র ৩
একক স্থানীয় অঙ্কটিকে ৯ দিয়ে গুণ করে, গুণফলকে বাকি সংখ্যা থেকে বিয়োগ করি। বিয়োগফল ৭ দ্বারা বিভাজ্য হলে ঐ সংখ্যাটিও ৭ দ্বারা বিভাজ্য। যেমন ৮৫৪-এর ক্ষেত্রে, ৮৫ – (৪ × ৯) = ৮৫ – ৩৬ = ৪৯। এখানে ৪৯ সংখ্যাটি ৭ দ্বারা বিভাজ্য হওয়ায় ৮৫৪ সংখ্যাটিও ৭ দ্বারা বিভাজ্য হবে। বড়ো সংখ্যার ক্ষেত্রে প্রাপ্ত বিয়োগফল স্বাভাবিকভাবেই বড়ো হবে। সেক্ষেত্রে নিয়মগুলোর পুনরাবৃত্তি করা যায়।
বড়ো সংখ্যার ক্ষেত্রে ৭ দ্বারা বিভাজ্যতার সহজ সূত্র:
কোনো বড়ো সংখ্যাকে ডানপাশ থেকে তিনটি তিনটি করে অঙ্ক নিয়ে সংখ্যা-গ্রুপে বিভক্ত করি। সংখ্যা-গ্রুপগুলো ডানপাশ থেকে পর্যায়ক্রমে যোগ ও বিয়োগ করি। প্রাপ্ত ফলাফল যদি ৭ দ্বারা বিভাজ্য হয়, তবে ঐ বড়ো সংখ্যাটিও ৭ দ্বারা বিভাজ্য হবে। যেমন, ৪৫৮১৬২৯০৩৭৩ সংখ্যাটি বিবেচনা করি। ডানপাশ থেকে তিনটি তিনটি অঙ্ক নিয়ে পাই, ৪৫,৮১৬,২৯০,৩৭৩।
ডানপাশ থেকে ১ম সংখ্যা-গ্রুপ = (+) ৩৭৩
ডানপাশ থেকে ২য় সংখ্যা-গ্রুপ = (-) ২৯০
ডানপাশ থেকে ৩য় সংখ্যা-গ্রুপ = (+) ৮১৬
ডানপাশ থেকে ৪র্থ সংখ্যা-গ্রুপ = (-) ৪৫
———————————————
ফলাফল = ৩৭৩ – ২৯০ + ৮১৬ – ৪৫ = ৮৫৪, যা ৭ দ্বারা বিভাজ্য।
সুতরাং ৪৫,৮১৬,২৯০,৩৭৩ সংখ্যাটিও ৭ দ্বারা বিভাজ্য।
বিভাজ্যতার নীতি নিয়ে বিস্তারিত ঃ