আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় বীজগণিতীয় প্রতীক ও চলক – যা অজানা রাশির জগৎ অধ্যায় এর অন্তর্ভুক্ত। গণিত হল জ্ঞানের একটি ক্ষেত্র যাতে সংখ্যা, সূত্র এবং সম্পর্কিত কাঠামো, আকার এবং সেগুলির মধ্যে থাকা স্থানগুলি এবং পরিমাণ এবং তাদের পরিবর্তনগুলি অন্তর্ভুক্ত থাকে। এই বিষয়গুলি যথাক্রমে সংখ্যা তত্ত্বের প্রধান উপশাখা,বীজগণিত, জ্যামিতি, এবং বিশ্লেষণ। তবে একাডেমিক শৃঙ্খলার জন্য একটি সাধারণ সংজ্ঞা সম্পর্কে গণিতবিদদের মধ্যে কোন সাধারণ ঐকমত্য নেই।
গণিতে সংখ্যা ও অন্যান্য পরিমাপযোগ্য রাশিসমূহের মধ্যকার সম্পর্ক বর্ণনা করা হয়। গণিতবিদগন বিশৃঙ্খল ও অসমাধানযুক্ত সমস্যাকে শৃঙ্খলভাবে উপস্থাপনের প্রক্রিয়া খুঁজে বেড়ান ও তা সমাধানে নতুন ধারণা প্রদান করে থাকেন।গাণিতিক প্রমাণের মাধ্যমে এই ধারণাগুলির সত্যতা যাচাই করা হয়। গাণিতিক সমস্যা সমাধান সম্পর্কিত গবেষণায় বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ বা শত শত বছর পর্যন্ত লেগে যেতে পারে। গণিতের সার্বজনীন ভাষা ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা একে অপরের সাথে ধারণার আদান-প্রদান করেন। গণিত তাই বিজ্ঞানের ভাষা।
বীজগণিতীয় প্রতীক ও চলক
বীজগণিতের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো অক্ষর প্রতীকের ব্যবহার। অক্ষর প্রতীক ব্যবহার করে আমরা নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যার বদলে যেকোনো সংখ্যা বিবেচনা করতে পারি।
তোমাদের নিশ্চয়ই মনে আছে, পাটিগণিতে বা সংখ্যার গল্পে আমরা সংখ্যা প্রতীক বা অঙ্ক হিসেবে ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭, ৮, ৯, ০ ব্যবহার করেছিলাম। বীজগণিতে সংখ্যা প্রতীক বা অঙ্কগুলো হলো 1, 2, 3, 4, 5, 6, 7, 8, 9,0। তাছাড়া বীজগণিতে সংখ্যা প্রতীকের সাথে অক্ষর প্রতীকও ব্যবহার করা হয়।
আর ইংরেজি বর্ণমালাগুলোকে ছোট হাতের অক্ষর দ্বারা জানা বা অজানা সংখ্যা বা রাশিকে প্রকাশ করা হয়।
নিচের ছবিতে সামির ও অনন্যা দিয়াশলাইয়ের কাঠি দিয়ে ইংরেজি বর্ণ C এর একটি প্যাটার্ন তৈরি করছে। প্রথম C তৈরিতে সামির ৩টি কাঠি (চিত্র-1) ব্যবহার করেছে। অনন্যা সামিরের তৈরি করা C এর সাথে আরও 3টি কাঠি দিয়ে চিত্র – 2 তৈরি করে। এই ভাবে উভয়ে মিলে চিত্র 3 এবং আরও কিছু C তৈরি করতে থাকে।

এই সময়ে তাদের বন্ধু অমিয়া আসে। সে প্যাটার্নটি দেখে সামির ও অনন্যাকে প্রশ্ন করে 6 নং চিত্রটি তৈরি করতে কতগুলো কাঠি লাগবে? তখন সামির ও অনন্যা নিচের ছকটি তৈরি করে।
অমিয়া ছক দেখে তার উত্তর পেয়ে গেল। সে বলল প্যাটার্নের 6 নম্বর চিত্রে 18টি কাঠির প্রয়োজন হবে।
ছকটি তৈরির সময় সামির ও অনন্যা বুঝতে পারে প্রতিটি চিত্র তৈরি করতে চিত্রের সংখ্যার 3 গুণ কাঠির প্রয়োজন হচ্ছে। অর্থাৎ প্রয়োজনীয় কাঠির সংখ্যা = 3x চিত্রের নম্বর।
যদি চিত্রের সংখ্যাকে একটি অক্ষর ১৫ দ্বারা প্রকাশ করা হয়, তবে প্রথম C এর জন্য n = 1, দ্বিতীয় C এর জন্য n = 2, তৃতীয় C এর জন্য n = 3,…. হবে। ফলে চিত্রের নম্বর n = 1, 2, 3, 4, …. ইত্যাদি স্বাভাবিক সংখ্যা হবে। ছক অনুসারে প্রয়োজনীয় কাঠির সংখ্যা হবে = 3 x n বা 3n এবং এটি একটি নীতি বা সূত্র।
অনন্যা বলে, এই সূত্র ব্যবহার করে আমি অতি অল্প সময়েই 100 তম চিত্র তৈরি করতে কতগুলো দিয়াশলাইয়ের কাঠি লাগবে তা বলে দিতে পারব। এক্ষেত্রে আমার চিত্র বা ছক তৈরির প্রয়োজন হবে না। অমিয়া ও সামির উভয়েই অনন্যার সাথে সহমত পোষণ করে।
উপরের উদাহরণ থেকে আমরা দেখতে পাই, ২ পরিবর্তন হলে প্রযোজনীয় কাঠির সংখ্যাও পরিবর্তন হয়। অর্থাৎ 177 কোনো নির্দিষ্ট মান নয়। এটি যেকোনো মান গ্রহণ করতে পারে। ” হলো চলকের (variable) একটি উদাহরণ। তোমাদের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, 12 ছাড়া অন্য কোনো অক্ষর কি চলক হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না?
নিশ্চয়ই যাবে। ৫ প্রতীকের পরিবর্তে x, y, z,…. ইত্যাদি প্রতীকও ব্যবহার করা যাবে। বাস্তব জীবনেও আমরা চলকের পরিচয় পেয়ে থাকি। চলো নিচের ছবিটি লক্ষ করি এবং নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করি।

- সময়ের সাথে সাথে গাড়ির গতিবেগ কি একই রকম থাকে?
- পৃথিবীর সকল স্থানের প্রতিদিনের তাপমাত্রার কোনো পরিবর্তন হয় কি?
- সময়ের সাথে সাথে শিশুর বৃদ্ধির কোনো পরিবর্তন হয় কিনা?
- বছরের পর বছর মানুষের বয়স বাড়ে না কমে?
ছবির ঘটনাগুলোর কোনোটিই নির্দিষ্ট নয়। অর্থাৎ এখানে ব্যবহৃত সংখ্যাগুলোর সবগুলোই পরিবর্তনশীল। সুতরাং সংখ্যাগুলোকে আমরা চলক বলতে পারি। চলকের মান স্থান ও সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়।
জোড়ায় কাজ: সামিরা ও অনন্যার মতো দিয়াশলাইয়ের কাঠি দিয়ে ইংরেজি F বর্ণের মতো প্যাটার্ন তৈরি করো। তারপর প্যাটার্নটিকে একটি ছকের মাধ্যমে দেখাও। ছক পর্যবেক্ষণ করে চিত্র ও প্রয়োজনীয় কাঠির সংখ্যার মধ্যকার সম্পর্ক একটি সূত্র বা নীতির মাধ্যমে প্রকাশ করো। সূত্রটি ব্যবহার করে 120 তম চিত্রের কাঠির সংখ্যা নির্ণয় করো।
চলক বা Variable সম্পর্কে আরও জানি
এবার চলো একটি উদাহরণের মাধ্যমে চলক বুঝতে চেষ্টা করি। তোমাদের ক্লাসে প্রতিদিন উপস্থিতির সংখ্যাটা কেমন? নিশ্চয়ই সংখ্যাটি একটি ভবঘুরে সংখ্যা। অর্থাৎ সব দিন এক রকম থাকে না। ক্লাসের সবাই একসাথে যুক্তি করে না আসলে সংখ্যাটা 0 হতে পারে, পরীক্ষার দিন আসলে আবার দেখা যাবে ক্লাসের সবাই উপস্থিত। তোমাদের ক্লাসের শিক্ষার্থীর মোট সংখ্যাটি নির্দিষ্ট হলেও দৈনিক উপস্থিতি দিনভেদে পরিবর্তিত হবে। এই “উপস্থিতি” রাশিটাকে তাই আমরা চলক নাম দিতে পারি এবং মজা করে বলতে পারি “থেমে না থেকে চলতে থাকে বলে চলক, vary করে বলেই variable”
