বাংলার গণিতচর্চার ইতিহাসে যেসব মনীষী তাঁদের প্রজ্ঞা, গবেষণা ও ত্যাগের আলোয় আজও আলোকিত, তাঁদের অন্যতম হলেন গণিত সম্রাট যাদব চন্দ্র চক্রবর্তী। গণিতকে সহজ, যুক্তিনির্ভর ও সাধারণ মানুষের উপযোগী করে তোলার যে অসাধারণ কৃতিত্ব তিনি দেখিয়েছেন, তার তুলনা উপমহাদেশে বিরল। তাঁর মেধার প্রতি মুগ্ধ হয়ে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে সম্মানিত করেছিল “গণিত সম্রাট”—এই উপাধি শুধু ব্যক্তিগত সম্মান নয়, বাংলা গণিতচর্চার জন্য এক গৌরবময় স্বীকৃতি।
শৈশব ও শিক্ষাজীবন — মাটির গন্ধে জন্ম, আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন
১৮৫৫ সালে সিরাজগঞ্জ জেলার কামারখন্দ উপজেলার ঝাঐল ইউনিয়নের তেঁতুলিয়া গ্রামে জন্ম নেওয়া যাদব চন্দ্র ছিলেন সরল গ্রামীণ বাংলার সন্তান। তাঁর পিতা কৃষ্ণ চন্দ্র চক্রবর্তী ও মাতা দুর্গা সুন্দরী—দু’জনেই শিক্ষানুরাগী। কৃষক পরিবারে জন্ম হলেও জ্ঞানচর্চার যে আলোর বাতাসা তিনি ছোটবেলা থেকেই পেয়েছিলেন, তা-ই তাঁকে গড়ে তোলে অসাধারণ প্রতিভায়।
শিশু বয়স থেকেই সংখ্যার প্রতি তাঁর অদ্ভুত টান ছিল। গ্রামীণ বিদ্যালয়ে পড়ালেখা করার সময় থেকেই শিক্ষকরা বুঝতে পারেন—এই ছেলেটি সাধারণ নয়, ব্যতিক্রমী এক গণিতপ্রতিভা।
উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি কলকাতায় যান। তখনকার সময়ে বাংলার প্রতিভাবানদের স্বপ্নের স্থান প্রেসিডেন্সি কলেজ। সেখানেই গণিতে কৃতিত্বের সঙ্গে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। এই সময় তাঁর ভাবনার দিগন্ত আরও প্রসারিত হয়; গণিতকে কীভাবে সহজ করা যায়, সাধারণ পাঠকের কাছে কিভাবে গ্রহণযোগ্য করা যায়—এসব ভাবনা তাঁকে শিক্ষকতা এবং গবেষণায় প্রবলভাবে আকৃষ্ট করে।
শিক্ষকতা জীবন — জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেওয়া
শিক্ষকতা শুরু হয় কলকাতা সিটি কলেজে। ছাত্রদের কাছে তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রিয়—কারণ তাঁর ব্যাখ্যা ছিল সহজ, বাস্তবমুখী এবং আনন্দময়। গণিতের জটিল সূত্রকেও তিনি গল্পের মতো শোনাতে পারতেন। এই সহজাত ক্ষমতাই তাঁর পরবর্তী সব লেখার ভিত তৈরি করে।
কিছুদিন পর তাঁর খ্যাতি পৌঁছে যায় আলীগড়ে। আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা স্যার সৈয়দ আহমদ খান তাঁর প্রতিভায় এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, তাঁকে নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতের অধ্যাপক হিসেবে আমন্ত্রণ জানান।
সৈয়দ সাহেব তাঁর জন্য আলাদা বাংলো ভাড়া করে দিয়েছিলেন—শিক্ষা, জ্ঞান ও প্রতিভাকে কত গভীরভাবে সম্মান করতে জানতেন, তার বিরল উদাহরণ এটি।
বই রচনায় বিপ্লব — গণিতকে সাধারণের দোরগোড়ায়
১৮৯০ সালে তাঁর লেখা ইংরেজি পাটিগণিত বইটি প্রকাশের পর শিক্ষাজগতে যেন নতুন যুগের সূচনা ঘটে। জটিল নিয়মকে তিনি এমনভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন যে, সাধারণ পাঠকরাও সহজে বুঝতে পারত। বইটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে পড়ে এবং বাংলা, হিন্দি, উর্দু, অসমিয়া, নেপালি, এমনকি মায়াবী ভাষায়ও অনূদিত হয়।
এই বইয়ের কারণেই তাঁকে উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গণিত-গবেষক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া শুরু হয়।
এখানেই থেমে থাকেননি তিনি।
১৯১২ সালে প্রকাশিত তাঁর বীজগণিত গ্রন্থও অসাধারণ সাড়া ফেলে। আনন্দবাজার, বঙ্গদর্শনসহ সমকালীন সব পত্রপত্রিকায় বইটির প্রশংসা প্রকাশিত হয়। বাংলার স্কুল-কলেজে বহু বছর ধরে এই বইগুলো ছিল পাঠ্য।
অবসর, প্রত্যাবর্তন ও প্রান্তিক জীবনের শিক্ষাসাধনা
১৯১৬ সালে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর গ্রহণের পর তিনি ফিরে আসেন তাঁর প্রিয় সিরাজগঞ্জে। আগেই তিনি ধানবান্ধি এলাকায় বাড়ি তৈরি করেছিলেন; অবসরজীবনে সেখানেই কাটান শান্ত ও একাগ্র দিন।
গ্রামের বাড়ি তেঁতুলিয়ায় তিনি নির্মাণ করেন একটি মন্দির—যা আজও স্থানীয় মানুষের কাছে তাঁর স্মৃতির পরিচায়ক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অবসরের সময়ও তিনি লেখালেখি, ছাত্রদের পরামর্শদান এবং গবেষণায় সক্রিয় ছিলেন—জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত।
শেষ যাত্রা — ৬৫ বছরের আলোকোজ্জ্বল অধ্যায়
১৯২০ সালের ২৬ নভেম্বর কলকাতার নিজ বাসভবনে তাঁর মৃত্যুর পর ভারত-বাংলা জুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক, গণিতজ্ঞ—সবাই তাঁকে স্মরণ করেন গভীর শ্রদ্ধায়। গণিতের মতো শুষ্ক বিষয়কে তিনি শিল্প-সৌকর্যের উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন।
গণিত সম্রাটের প্রতি আমাদের চিরন্তন প্রণাম
যাদব চন্দ্র চক্রবর্তী শুধু একজন শিক্ষক বা লেখক নন; তিনি ছিলেন বাংলার গণিতশাস্ত্রের একজন আলোকবাহক। তাঁর লেখা বইগুলো এখনো গবেষণা ও প্রেক্ষাপট আলোচনায় স্মরণীয়। তিনি গণিতকে ভয়ের নয়, আনন্দের বিষয় হিসেবে তুলে ধরেছিলেন।
আজকের প্রজন্মের উচিত—এই মহামানবকে নতুন করে জানা, তাঁর লেখা নতুনভাবে মূল্যায়ন করা এবং তাঁর চেতনা থেকে গণিতের প্রতি ভালোবাসা শেখা।
গণিত সম্রাট যাদব চন্দ্র চক্রবর্তীর প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।
বাংলার গণিতচর্চা তাঁকে চিরকাল কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করবে।